এর আগে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন পর্যন্ত রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছরের মাত্র নয় মাসেই ঘাটতির সে রেকর্ড অতিক্রম করেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) রাজস্ব আয় বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় এ ঘাটতি এনবিআরের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে অর্থবছরের বাকি অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা করে রাজস্ব আয় করতে হবে সংস্থাটিকে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সংস্থাটি মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আহরণ করতে পেরেছে। এ সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী, নয় মাসে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায়। মার্চে সংস্থাটির জন্য আহরণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিল ৬০ হাজার ৫০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ৩৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা আহরণ হয়েছে।
এর আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রথম নয় মাসের তুলনায় অবশ্য চলতি অর্থবছরের একই সময় এনবিআরের রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে নয় মাসে সংস্থাটি মোট রাজস্ব আহরণ করেছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থনীতিবিদরা অবশ্য বলছেন, প্রবৃদ্ধির দেখা পেলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এ অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব না বাড়ায় বাজেট বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হতে পারে।
লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মূলত কাস্টমস ও ভ্যাট খাতের কয়েকটি উপখাত থেকে প্রত্যাশামতো আহরণ না হওয়াকে দায়ী করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। এ নয় মাসে পণ্য আমদানি থেকে শুল্ক আহরণ কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যদিও আমদানি পর্যায়ে আরোপিত মূসক ও সম্পূরক শুল্ক থেকে আহরণ বেড়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কাস্টমস খাত থেকে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৮০ হাজার ২২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। যদিও লক্ষ্যমাত্রায় তা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে আহরণ বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ভ্যাট খাতেও আবগারি শুল্ক, টার্নওভার ট্যাক্স ও স্থানীয় পর্যায়ে আরোপিত অন্যান্য মূসক বাবদ রাজস্ব আহরণ কমেছে এনবিআরের। যদিও সার্বিকভাবে নয় মাসে সংস্থাটির ভ্যাট থেকে আহরণ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর আয়কর থেকে মোট আহরণ বেড়েছে ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থবছরের শেষ তিন মাসে রাজস্ব আহরণ এমনিতেই বেড়ে যায়। কারণ সারা বছর যারা কর-ভ্যাট পরিশোধ করেননি, তারা অনেকেই এ সময় দ্রুত পরিশোধ করে দেন। তবে লক্ষ্য পূরণ হয়তো কঠিন হবে। স্বাভাবিক সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হয়তো অসম্ভব ছিল না। কিন্তু অর্থনীতি এখন খারাপ সময় পার করছে। জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে সব খাতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ছোট-বড় সবার ওপরেই এর প্রভাব পড়ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে হয়তো রাজস্ব আহরণ কিছুটা বাড়ানো যাবে। কিন্তু স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে যে রাজস্ব আসত, সেটি তো এখন হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে এখন রেমিট্যান্সসহ নানা মাধ্যমে যেসব অর্থ আসছে, সেগুলোকে যাতে অলস পড়ে না থাকে সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তাহলেই রাজস্ব আহরণ বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আর এনবিআরকেই বলতে হবে, সংস্থাটি আসলে কতটা রাজস্ব আহরণ করতে পারবে। ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে হবে না। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হলে রাজস্ব আহরণের চাপটা বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই পড়ে।’